ঢাকা, বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, , ২ রমজান ১৪৪২
Reg:C-125478/2015

করোনাকালে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অজু


প্রকাশ: ৫ এপ্রিল, ২০২১ ০৬:৩৮ পূর্বাহ্ন


করোনাকালে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অজু

বৈশ্বিক মহামারি করোনা শুরুর পর দেশে দেশে হাত ধোয়ার ব্যাপারে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও সমাজকর্মীরা সোচ্চার হয়েছেন। হাত যেন পরিষ্কার থাকে, হাত থেকে হাতে বা হাত থেকে নাকে-মুখে যেন ভাইরাস না ছড়ায় সেটিই ছিল এই প্রচেষ্টার লক্ষ্য। হাত ধোয়ার ব্যাপারে সচেতনতা তৈরির জন্য প্রতিবছর ১৫ অক্টোবর বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস নামে একটি দিবসও পালন করা হয়। দুটি চেষ্টাই ঐচ্ছিক। ব্যক্তি চাইলে করতে পারে, না-ও পারে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ইসলামী শরিয়তের মাধ্যমে মানবজাতিকে এমন ব্যবস্থাপত্র প্রদান করেছেন, যাতে একজন মুসলিম প্রতিদিন ১৫ বার করে শুধু হাতই নয়; বরং নাক-মুখসহ দেহের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গ ধুতে হয় এবং সেটি আবশ্যিকভাবে। যার নাম অজু।

একজন মুসলিম পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচবার অজু করে থাকেন। এই অজুগুলোতে সে ১৫ বার কনুই পর্যন্ত হাত ধোয়, ১৫ বার কুলি করে, ১৫ বার নাক পরিষ্কার করে, ১৫ বার সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল ধোয়, ১৫ বার পা ধোয়, পাঁচবার মাথা ও ঘাড় মাসেহ করে (ভেজা হাত বোলানো)। অজুতে কাজগুলো বিশেষ যত্নসহ করা হয়। পরিষ্কার যেন ঠিকভাবে হয় বা অণুমাত্র অংশও যেন শুকনো থেকে না যায়, সে ব্যাপারে তারা যথেষ্ট সচেষ্ট থাকে। এভাবে প্রতিদিন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো ১৫ বার করে ধোয়ার ফলে শরীর যেমন পরিচ্ছন্ন থাকে, তেমনি তাতে কোনো ধরনের রোগ-জীবাণু সংক্রমণের আশঙ্কা বহুলাংশে কমে যায়। তাই অজু হতে পারে স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম মাধ্যম, সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরক্ষা।

মানুষের শরীরের যেসব অঙ্গ খোলা থাকে যেমন হাত, মুখ, নাক, চোখ, পা ইত্যাদি অজুর মাধ্যমে প্রতিদিন ১৫ বার ধোয়া হয়। এতে অঙ্গগুলো পরিষ্কার হয়ে যায়। সব সময় খোলা থাকার কারণে বিভিন্ন কাজ করার সময় এগুলোতে বিভিন্ন ধরনের ধুলা-ময়লা জমে এবং দুর্গন্ধ তৈরি হয়। অজুর মাধ্যমে তা দূর হয়। দিনের অজু ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করে, ফজরের অজু সারা রাতের ঘুমের পর ব্যক্তিকে সতেজ করে তোলে। এতে মানুষের মনে-মগজে কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি পায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অজুর অনেকগুলো উপকারের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন মানবদেহের বাহ্যিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করার জন্য দেহে  Lymphatic Sistem সঠিক পদ্ধতিতে সক্রিয় হওয়া আবশ্যক। অজু এ কাজে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মানবদেহের অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে নাসারন্ধ্র্রের মধ্যে থাকা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পরিচ্ছন্নতা ও সুরক্ষা আবশ্যক। শুধু অজুর মাধ্যমেই নাসারন্ধ্রের এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধোয়া হয়ে থাকে। অজুর মাধ্যমে ঘাড়ের দুই পাশে কম্পন সৃষ্টি করা যায়। এতে  Lymphatic Sistem আরো সক্রিয় হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুমের জন্য বিছানায় যাওয়ার আগে নিয়মিত অজু করতেন। বারা ইবনে আজিব (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেছেন, তুমি যখন বিছানায় যাওয়ার ইচ্ছা করো, তখন অজু কোরো, যেভাবে তুমি সালাতের জন্য অজু করো। (সহিহ বুখারি)

চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা ঘুমের আগে অজু করার যৌক্তিকতা খুঁজে পেয়েছেন। দিনভর মাটি, ময়লা, ধুলা ও জীবাণুগুলো দেহের ছিদ্রে জমা হয়ে চামড়াকে দূষিত করে থাকে। মুখের ত্বকে ও চোখে ক্ষতিকর ধুলাবালি জন্মে। অজুর মাধ্যমে শরীরের খোলা অঙ্গগুলো এবং চোখকে রাতের দীর্ঘ সময়ে এসব ময়লার ক্ষতি থেকে রক্ষায় ঘুমুতে যাওয়ার আগের অজু অত্যন্ত কার্যকর।

রাসুল (সা.) বলেছেন, মুমিন যখন অজুতে হাত ধুয়ে ফেলে তখন হাতের গুনাহ পড়ে যেতে থাকে। এমনকি নখের নিচ দিয়েও পড়তে থাকে। (সুনান নাসায়ি)

মানুষ প্রাত্যহিক কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে হাত। হাতে ময়লা জমে, নানাবিধ রোগের জীবাণু জমা হয়, বিভিন্ন কেমিক্যাল পুঞ্জীভূত হয়ে হাতকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। কেননা শরীরের সব অঙ্গে হাতের স্পর্শ লেগে থাকে। এর মাধ্যমে নাক-মুখ ও অন্যান্য ত্বক সহজেই জীবাণু সংক্রমণের আওতায় চলে আসে। অজুতে প্রতিদিন ১৫ বার হাত ধোয়ার ফলে এ ঝুঁকি কমে যায়। মহানবী (সা.) গুনাহ ঝরে পড়ার যে ঘোষণা দিয়েছেন তাতে নখের নিচ থেকেও গুনাহ ঝরে পড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা যে নখের নিচে আরো বেশি জীবাণু জন্মে। তাই নখ পরিষ্কারে বেশি যত্ন নেওয়া আবশ্যক।

মহানবী (সা.) বলেছেন, যখন মুমিন অজু করার সময় কুলি করে, তখন তার মুখের সব গুনাহ ঝরে যায়। (সুনান নাসায়ি)

অজুতে প্রতিদিন ১৫ বার কুলি করা হয়। এর দ্বারা দাঁতের ভেতরের খাদ্যকণা, মুখগহ্বরের ক্ষতিকর ময়লা ও জীবাণু বের হয়ে আসে। কুলি মুখকে পরিষ্কার করে। এটি দাঁতের রোগ থেকে রক্ষা করে। চোয়াল মজবুত করে। দাঁতের ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি করে। এর ফলে যেমন জীবিকা বৃদ্ধি পায় তেমনি ব্যক্তি টনসিলের প্রকোপ থেকে সুরক্ষিত থাকে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, মুমিন যখন অজু করার সময় নাকে পানি দেয় তখন নাকের সব গুনাহ ঝরে যায়। (সুনানে নাসায়ি) প্রতিটি মানুষ প্রতিদিন প্রায় শত ঘনফুট বায়ু নাকের মাধ্যমে গ্রহণ করে। এ সময় বায়ুর পাশাপাশি বহু রোগ-জীবাণুও নাক দিয়ে দেহে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যায়। অজু নাককে বাইরের ধুলা-ময়লা থেকে দেহকে সুরক্ষিত রাখায় ভূমিকা রাখে।

নবীজি (সা.) বলেছেন, মুমিন অজুতে যখন নিজের চেহারা ধুয়ে ফেলে তখন তার চেহারার গুনাহগুলো ঝরে পরে এমনকি চোখের পালকের পাপড়ি থেকেও গুনাহ বের হয়ে আসে। (সুনানে নাসায়ি)

অজুতে মুখমণ্ডল ধোয়ার কারণে চেহারায় নম্রতা ও কমনীয়তা সৃষ্টি হয়। ধুলা-ময়লার কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া লোমকূপ খুলে যায়। এতে মুখমণ্ডলের ত্বকে অক্সিজেনের সরবরাহ বেড়ে যায়। চেহারা ঔজ্জ্বল্য, পূর্ণ ও আকর্ষণীয় হয়। চোখের সাদা অংশ ও মণির উজ্জ্বলতা বেড়ে যায়। অজুতে দাড়ি খিলাল করতেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, এর দ্বারা বহু রকমের জীবাণু দূর হয়ে যায়। দাড়ির চুলে জমে থাকা পানি গলায় শক্তি জোগায়। এটি থাইরয়েড ও গলার রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, অজুকারী যখন মাথা মাসেহ করে, তখন তার মাথা থেকে গুনাহগুলো ঝরতে থাকে। এমনকি তার দুই কানের নিচ থেকেও। (সুনানে নাসায়ি)

অজুতে কান মাসেহ করা হয়। কানের ভেতরের দিকে ভেজা তর্জনী দ্বারা এবং বাইরের দিক আঙুল দ্বারা মাসেহ করার মাধ্যমে কানের ময়লা দূর হয়। কান নানাবিধ সংক্রামক ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকে। এর দ্বারা শ্রবণশক্তির ওপর অন্তরঙ্গ প্রভাব পড়ে। মানবদেহের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে ময়লা, কাদা, ধুলা, জীবাণু, আবর্জনা ইত্যাদি পায়ে লাগার আশঙ্কাই সবচেয়ে বেশি থাকে। নানা কারণে পায়ের সুরক্ষা আবশ্যক। প্রতিদিন পাঁচ অজুতে ভালোভাবে পা ধোয়ার কারণে পায়ের সংরক্ষণ সঠিকভাবে সম্পন্ন হতে পারে।

 


   আরও সংবাদ