ঢাকা, বুধবার, ১৬ জুন ২০২১, , ৬ জ্বিলক্বদ ১৪৪২
Reg:C-125478/2015

তীব্র জলাবদ্ধতার কবলে নগরবাসী


প্রকাশ: ৭ জুন, ২০২১ ১১:০৪ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১১৫ বার


তীব্র জলাবদ্ধতার কবলে নগরবাসী

নগর জীবন; শেষ পর্যন্ত নগরবাসীর শঙ্কা সত্যিই হলো। ভারী বৃষ্টিতে ডুবল নগরের সিংহভাগ এলাকা। তীব্র জলাবদ্ধতার কবলে পড়লেন স্থানীয়রা। থাকতে হলো ছয় ঘণ্টারও অধিক সময় পানিবন্দি। দুর্ভোগ ও ভোগান্তি পথচারীদের যেতে হলো গন্তব্যে। গতকাল রোববার সকাল থেকে শুরু হয় বৃষ্টি। সময়ের সাথে সাথে বাড়ে বৃষ্টির গতিও। ১২টা পর্যন্ত একটানা ভারী বর্ষণের পর কমে আসে গতি। এরপর থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে সন্ধ্যা পর্যন্ত। তবে সকালের বৃষ্টিই ছিল যত দুর্ভোগের কারণ। বৃষ্টির সময় ছিল না জোয়ার। তবুও কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর সমান পানিতে নগরবাসীর দুর্ভোগ হয়ে ওঠে অসহনীয়। রাস্তাঘাট তো ডুবেছে। বিভিন্ন বাসা-বাড়ির নিচতলায় পানি ঢোকে। হাসপাতাল থেকে মার্কেট সব জায়গা ছিল পানিতে সয়লাব।

সাধারণত বৃষ্টি ও জোয়ার এক সাথে হলে তীব্রতা বাড়ে জলজটের। কিন্তু গতকাল জোয়ার ছাড়াই হয়েছে জলাবদ্ধতা। মেগা প্রকল্পের জন্য খালে বাঁধ ও রাস্তা করে পানি চলাচলের পথ হওয়া ছিল এর কারণ। যদিও পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার দাবি করেছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

বৃষ্টিপাতের পরিমাণ : গতকাল সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। এ তিন ঘণ্টায় ৪৪ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। এছাড়া ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত ২০ মিলিমিটার, ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এর আগে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ৩ ঘণ্টায় হয়েছে ২ দশমিক ৪ মিলিমিটার।

এদিকে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৯৮ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। একইভাবে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় বিকাল ৩টায় ৭৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার, দুপুর ১২টায় ৭৫ দশমিক ৪ মিলিমিটার, সকাল ৯ টায় ৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার ও সকাল ৬টায় ৩৩ দশমিক ৪ মিলিমটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এদিকে গতকাল বিকেল ৪টায় পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার আহাওয়া অফিসের ভারী বর্ষণ সংক্রান্ত সর্তকবার্তায় বলা হয়, বাংলাদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় পশ্চিমা লঘুচাপের সাথে পূবালী বায়ুর সংমিশ্রণের ফলে চট্টগ্রাম ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী (২৪ ঘণ্টায় ৪৪-৮৮ মিমি) থেকে অতি ভারী (২৪ ঘণ্টায় ৮৯ মিমি বা তার বেশি) বর্ষণ হতে পারে।

আবহাওয়াবিদ ও পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা ড. মু শহিদুল ইসলাম বলেন, আজ অস্থায়ী দমকা, ঝড়ো হাওয়াসহ অধিকাংশ জায়গায় মাঝারি থেকে মাঝারি ধরনের ভারী বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। রাত ও দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব অথবা দক্ষিণ দিক থেকে ঘণ্টায় ১২ থেকে ১৮ কিলোমিটার বেগে, যা অস্থায়ী দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

এলাকাভিত্তিক পানির চিত্র : সকাল সাড়ে ১২টার দিকে বহদ্দারহাট মোড়ে দেখা গেছে পানির তীব্র স্রোত। বহদ্দারহাট থেকে কাপাসগোলা হয়ে তেলিপট্টির আগ পর্যন্ত হাঁটু সমান পানি দেখা গেছে। এখানে পানির জন্য যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে লোকজন হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছেন। চকবাজার কাঁচাবাজারের সামনেও ছিল বেহাল দশা। চক সুপার মার্কেটে পানি ঢুকে গেছে। কাঁচাবাজার থেকে রাহাত্তারপুল সড়কও তলিয়ে যায়। সেখানে বিভিন্ন দোকানপাটে পানি ঢোকে।

ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকার লোকজনও ছিল পানিবন্দি। ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব বলেন, ওয়ার্ডের আলকরণ ১, ২ ও ৩ নং গলি, বাটা গলি, ডা. মান্নান গলি, আরসি চার্চ রোড, ব্যাপটিস্ট মিশন রোড, এয়াকুব নগর, বংশাল রোড, টেকপাড়া, নোয়াপাড়ায় বৃষ্টির পানিতে মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়েন। তাদের খোঁজখবর নিতে গিয়েছিলাম।

দুপুর একটার দিকে জামালখান ওয়ার্ড কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন জানান, জামালখান বাইলেইন, দেওয়ানজী পুকুর গীতাঞ্জলী কলোনি, আসকারদিঘি পাড় এবং কাজীর দেউড়ি আংশিক নিম্নাঞ্চলে পানি দেখা যাচ্ছে। এদিকে জামালখান শিকদার হোটেলের পাশের গলিতেও জলজট ছিল বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা শৈবাল পারিয়াল।

আলকরণ ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় বাসা-বাড়িতে পানি ঢুকেছে। কাউন্সিলর আবদুস সালাম মাসুম বলেন, হাঁটু সমান পানি হয়েছে রেয়াজুদ্দিন বাজারে। বিভিন্ন দোকানে পানি ঢুকেছে। তিন পুলের মাথায় জুবিলি রোডের পানি গোলাম রসুল মার্কেট দিয়ে ঢুকেছে। তিনি বলেন, ফলমন্ডি থেকে দক্ষিণ নালাপাড়া হয়ে ইসলামিয়া কলেজের দিকে আলকরণে প্রবেশ করে মনোহরখালী খাল। খালটিতে জলাবদ্ধতা প্রকল্পের বাঁধ ছিল। ফলে রেয়াজুদ্দিন বাজার থেকে পানি টানলেও নালাপাড়াবাসী কষ্ট পেয়েছে। মানুষজন নিয়ে বাঁধটি ভেঙে দিয়েছি। এতে পানি নেমে যায়। দোভাষ কলোনির বিভিন্ন বাসায় পানি ঢুকে গেছে।

বৃষ্টি শুরুর এক-দেড় ঘণ্টার মধ্যে মুরাদপুর জলিল বিল্ডিং লেইন শহীদ জানে আলম সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায় বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাশেম। এখানে বিভিন্ন বাসার নিচতলায় পানি ঢুকে গেছে। বহদ্দারহাট থেকে মুরাদপুর, ২ নং গেট থেকে জিইসি হয়ে ওয়াসা পর্যন্ত প্রধান সড়কেও হাঁটু থেকে কোমর পানি দেখা গেছে। শুলকবহর ফ্লাইওভারের মুখে কোমর সমান পানি ছিল। শুলকবহরের নিচু অংশে বিভিন্ন বাসা-বাড়ির নিচতলায় পানি ঢুকে গেছে।

২ নং গেট বেবি সুপার মার্কেটের পেছনে ছিল কোমর পানি। স্থানীয় বাসিন্দা রুবায়েত বলেন, চশমা মসজিদে পানি ঢুকেছে। পুনর্বাসন এলাকার বেশিরভাগ ঘরে পানি ঢোকে। মুরাদপুর মোহম্মদপুর রোডও তলিয়ে যায় পানির নিচে। কয়েকটি বাসার নিচতলায় জমে যাওয়া পাম্প মেশিন দিয়ে সরাতে দেখা গেছে। প্রবর্তক মোড়েও ছিল হাঁটু থেকে কোমর পানি।

এদিকে ষোলশহর, কাপাসগোলা, চকবাজার বাদুরতলা, আবদুল হামিদ লেইন, চাক্তাই, বাকলিয়া, ডিসি রোড, রহমতগঞ্জ, হালিশহর, চান্দগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকা, কাতালগঞ্জ, চকবাজার জেলেপাড়া, মুহাম্মদ আলি শাহ দরগাহ লেইন, ডিসি রোড, ঘাসিয়ার পাড়া, ফুলতলা, কে বি আমান আলী রোড, ঝর্ণাপাড়া ও রসুলবাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। আগ্রাবাদ, সিডিএ আবাসিক, কমার্স কলেজ রোড, হালিশহর, নয়াবাজার বিশ্বরোড, পতেঙ্গার আকমল আলী রোড, মাইজপাড়া, দক্ষিণ পতেঙ্গায়ও হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি ছিল।

সেখানে বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে পানি ঢুকেছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা শাহেদ। এছাড়া দক্ষিণ কাট্টলী এলাকায় পানি জমে। মার্কেটেও পানি : পানি ঢুকেছে রেয়াজুদ্দিন বাজারের বিভিন্ন দোকানপাটে। সেখানে কাপড়ের গলির প্রায় দোকানে পানি প্রবেশ করে। রেয়াজুদ্দিন বাজার বণিক কল্যাণ সমিতি হাজী মাহবুবুল আলম বলেন, অন্য গলির চেয়ে কাপড়ের গলি একটু নিচু। তাই সেখানে পানি ঢোকে। ব্যবসায়ীদের কয়েক লক্ষ টাকার মালামাল ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ৩০ বছর ধরে রেয়াজুদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ীরা কষ্ট পাচ্ছে। বৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথে কাউন্সিলর আবদুস সালাম মাসুম ভাই আসেন। ব্যবসায়ীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। ময়লার স্তূপ জমতে দেননি। এজন্য তাকে ব্যবসীয়দের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ।

এদিকে পানি ঢুকেছে গোলাম রসুল মার্কেটেও। মার্কেটটির মডার্ন প্লাস্টিক হাইজের স্বত্বাধিকারী ফখরুল আলম বলেন, ১২০টির মতো দোকান আছে। প্রতি দোকানদারের গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার মালামাল নষ্ট হয়েছে। বহদ্দারহাটের হক মার্কেট ও স্বজন সুপার মার্কেট, চকবাজার সুপার মার্কেট ও রেয়াজুদ্দিন বাজারের বিভিন্ন দোকানপাটে পানি ঢুকে গেছে। রেয়াজুদ্দিন বাজারে তেমন ক্ষয়ক্ষতি না হলেও হক মার্কেট ও স্বজন সুপার মার্কেটর ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি করেছেন।

বহদ্দারহাট হক মার্কেট (ইউনিট-২) ব্যবসায়ী সমিতির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক মোহাম্মদ তারেকুল ইসলাম জানান, নিচতলায় ২৩০টির মতো দোকান আছে। প্রায় সবগুলোতে পানি ঢুকে গেছে। আনুমনিক ৩০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
স্বজন সুপার মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, নিচতলার প্রায় একশ দোকানের সবগুলোতে পানি ঢুকেছে। পার্শ্ববর্তী নালায় সিটি কর্পোরেশনের মার্কেট থাকায় নালাটি পরিষ্কার করা হয়নি। তাই পানি ওঠে বলে দাবি করেন তিনি।

হাসপাতালে পানি : আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের নিচতলায় পানি প্রবেশ করে। এতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। নিচতলায় থাকা একটি ওয়ার্ড সাময়িকভাবে দ্বিতীয় তলায় স্থানান্তর করা হয়।
হাসপাতালের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. নুরুল হক বলেন, নিচতলার আউটডোর চিকিৎসাসেবা নতুন ভবনে স্থানান্তর করেছি। দাপ্তরিক কাজ করতেও তেমন সমস্যা হয়নি। পানির মধ্যে হাঁটতে হয়েছে। রোগী ও তাদের স্বজনদের কষ্ট হয়েছে।

পথচারীর দুর্ভোগ : রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন পথচারীরা। সকালে কর্মস্থলমুখী মানুষের দুর্ভোগ ছিল অসহনীয়। বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদে নিজের দোকানে যাচ্ছিলেন করিম। তিনি বলেন, ২ নং গেট আসতেই জ্যামে পড়ি। প্রায় আধ ঘণ্টা আটকে ছিলাম গাড়িতে। শহীদ বলেন, জিইসি থেকে চান্দগাঁও যাওয়ার সময় গাড়ি পাচ্ছিলাম না। তাই বাধ্য হয়ে রিকশায় চড়ি। তবে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ভাড়া ছিল চার গুণ।
এদিকে সড়কে পানি থাকায় বিভিন্ন গণপরিবহন ও প্রাইভেট গাড়ি ব্যবহার করে আক্তারুজজ্জামান ফ্লাইওভার। কিন্তু শুলকবহরে ফ্লাইওভার থেকে নামার মুখে প্রায় কোমর সমান পানি ছিল। তাই গাড়িগুলো এগোতে পারেনি। প্রায় ঘণ্টাদুয়েক ফ্লাইওভারে আটকে ছিল বিভিন্ন যানবাহন।


   আরও সংবাদ