ঢাকা, বুধবার, ১৬ জুন ২০২১, , ৬ জ্বিলক্বদ ১৪৪২
Reg:C-125478/2015

ঘরপোড়া বস্তিবাসীর পেটে জোটেনি কোন খাবার


প্রকাশ: ৭ জুন, ২০২১ ১৩:৫৮ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৩৭ বার


ঘরপোড়া বস্তিবাসীর পেটে জোটেনি কোন খাবার

নগর জীবন: পুড়ে যাওয়া ঘরের কাছে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সালেহা বেগম। তার কান্নার আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠে সাততলা বস্তির আকাশ। মাথার উপরে খোলা আকাশ ছাড়া আর কিছুই নেই সালেহার। ভোরের আগুনে সবকিছুই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘মাইয়ার জামা-কাপড়, গহনা, টাকা-পয়সা সব পুইড়া ছাই হইছে। ত্রিশ কেজি চাল, তেল, ডাল, টিভি-ফ্রিজ, আলমারি কিছুই নাই। সব কয়লা হয়ে গেছে। খালি জানডা লইয়া কোনো রকম বাইর হইয়া আইছি।’

গত ১০ বছর ধরে মহাখালীর সাততলা বস্তিতে স্বামী ও দুই মেয়েকে নিয়ে বাস করছিলেন সালেহা। তার স্বামী একটি হোটেলে কাজ করেন আর তিনি মানুষের বাসা-বাড়িতে কাজ করেন। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত কেউ খাবার নিয়ে আসেনি। কিনে খাওয়ার মতো টাকাও কাছে নেই। এ কারণে শুধু পানি খেয়ে গলা ভিজিয়েছেন।

সোমবার ভোররাত ৪টার দিকে সাততলা বস্তিটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে পুরো বস্তিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের প্রচেষ্টায় প্রায় তিন ঘণ্টা পর সকাল ৭টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এতে প্রায় এক হাজার ঘর পুড়ে গেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এসব ঘরপোড়া মানুষের প্রাণ আর গায়ের কাপড় ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই। বেলা ১২টা পর্যন্ত কেউ তাদের সাহায্য-সহযোগিতাও করেননি।

বস্তিবাসী জানান, আগুনের সূত্রপাত বস্তির পশ্চিম-দক্ষিণ দিক থেকে। এরপর দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে বস্তির উত্তর-পূর্ব দিকে। একে একে পুড়ে যায় দেড় শতাধিক ঘর।

আগুন লাগার পর আট মাস বয়সী সন্তান কোলে নিয়ে এক কাপড়ে বেরিয়েছেন শিল্পী আক্তার। তিনি স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকেন বস্তিতে। কাজ করেন পোশাক কারাখানায়।

শিল্পী আক্তার জানান, আগুন লাগার পর হইচই শুনে হঠাৎ ঘুম ভাঙে। এরপর স্বামী আর মেয়েকে নিয়ে বের হয়ে যান। তারা শুধু মোবাইলটা ছাড়া আর কিছুই নিয়ে ঘর থেকে বের হতে পারেননি। গার্মেন্টসে চাকরি করে অনেক কষ্টে কেনা সবকিছুই মুহূর্তের মধ্যে পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। দুপুর পর্যন্ত কিছুই খাননি। কেউ খাওয়ার কথা জানতেও চায়নি।

মাত্র চার মাস আগে বিয়ে করেছিলেন রাকিবুল ইসলাম। কাজ করেন একটি কারখানায়। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি থেকে কিছু আসবাবপত্র দিয়েছিল কিন্তু তিন ঘণ্টার ভয়াবহ আগুনে সব পুড়ে শেষ হয়ে গেছে রাকিবুলের।

তিনি বলেন, ‘বিয়ে করেছি মাত্র চার মাস আগে। নতুন সংসার। শ্বশুরবাড়ি থেকে কিছু দামি আসবাবপত্র দিয়েছিল। আর কারখানায় কাজ করে প্রতিমাসে এক হাজার টাকা জমাতাম। আগুনে সবকিছু পুড়ে গেছে। বউকে কোথায় রাখব, কী করবো, নতুন বউ নিয়ে কোথায় যাবো, কী খাবো কিছুই জানি না।’

শফিকুল ইসলাম নামের আরেকজন বলেন, ‘সব পুড়ে শেষ। পরনের লুঙ্গিটুকুই এখন একমাত্র সম্বল। আগুন লাগার শোরগোল শুনে ঘুম থেকে উঠে তাড়াতাড়ি করে রাস্তায় চলে আসি। এরপর একটার পর একটা ঘর দাউ দাউ আগুনে পুড়ে ছারখার হতে দেখি নিজের চোখের সামনে।’

এদিকে, সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও বস্তিবাসীর সাহায্য-সহযোগিতায় ব্যক্তি কিংবা কোনো সংগঠনকে দেখা যায়নি।

ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘বস্তিতে টিনের ঘর অনেক বেশি সেপারেশন হওয়ায় আমাদের আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়েছে। এছাড়া দাহ্য বস্তুর উপস্থিতি বেশি থাকায় আগুনটা বেশি ছড়িয়েছে।’

আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এখানে প্রচুর পরিমাণে অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন রয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে মনে করছি, এই দুইটার যেকোনো একটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।’

বস্তির বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানান, বস্তিজুড়ে কাঠ ও টিনশেডের ঘর। পুরো বস্তিতে প্রায় দুই হাজার ঘর রয়েছে। এর অর্ধেকই পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর।


   আরও সংবাদ